শিশুরা কেন বারবার অসুস্থ হয়, কারণ ও ডাক্তারদের সমাধান
প্রায় প্রতিটি বাবা-মায়েরই একটি সাধারণ অভিযোগ হলো—”আমার সন্তান বারবার অসুস্থ হয়ে পড়ে।” কখনও সর্দি-কাশি, কখনও জ্বর, আবার কখনও গলা ব্যথা বা পেটের সমস্যা। এতে অনেক অভিভাবক ভাবেন, শিশুর শরীরে হয়তো বড় কোনো সমস্যা রয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ছোট শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা (Immune System) ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে। তাই জীবনের প্রথম কয়েক বছরে তারা তুলনামূলক বেশি অসুস্থ হওয়াটা অনেক ক্ষেত্রেই স্বাভাবিক।
তবে সব ধরনের অসুস্থতাকে স্বাভাবিক বলে অবহেলা করা উচিত নয়। যদি শিশুর অসুস্থতা খুব ঘন ঘন হয়, দীর্ঘস্থায়ী হয় অথবা গুরুতর লক্ষণ দেখা দেয়, তাহলে অবশ্যই শিশু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
এই নিবন্ধে জানুন শিশুরা কেন বারবার অসুস্থ হয়, এর প্রধান কারণ, প্রতিরোধের উপায় এবং চিকিৎসকদের পরামর্শ।
১. রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা পুরোপুরি বিকশিত না হওয়া
শিশুর জন্মের পর থেকেই তার শরীর নতুন নতুন ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়ার সঙ্গে পরিচিত হতে শুরু করে। এসব জীবাণুর বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে ধীরে ধীরে ইমিউন সিস্টেম শক্তিশালী হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্কুল বা ডে-কেয়ারে যাওয়া শিশু বছরে ৬ থেকে ৮ বার পর্যন্ত সর্দি-কাশি বা ভাইরাল সংক্রমণে আক্রান্ত হতে পারে। এটি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই স্বাভাবিক একটি বিষয়।
২. স্কুল বা ডে-কেয়ারে জীবাণুর সংক্রমণ
শিশুরা একসঙ্গে খেলাধুলা করে, একই খেলনা ব্যবহার করে এবং অনেক সময় হাত না ধুয়েই খাবার খায়। ফলে একজনের শরীরের ভাইরাস খুব সহজেই অন্যজনের শরীরে ছড়িয়ে পড়ে।
যেসব সংক্রমণ বেশি দেখা যায়—
- ভাইরাল সর্দি-কাশি
- ইনফ্লুয়েঞ্জা
- হাত-পা-মুখ রোগ
- ভাইরাল জ্বর
- কনজাংকটিভাইটিস
৩. পুষ্টিকর খাবারের অভাব
সুষম খাদ্যের অভাবে শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে যায়। শুধু পেট ভরলেই হবে না, খাবারে পর্যাপ্ত ভিটামিন, মিনারেল, প্রোটিন এবং স্বাস্থ্যকর চর্বি থাকতে হবে।
শিশুর খাদ্যতালিকায় রাখুন—
- ডিম
- মাছ
- দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার
- ডাল
- শাকসবজি
- মৌসুমি ফল
- বাদাম (বয়স অনুযায়ী নিরাপদ হলে)
অতিরিক্ত চিপস, চকোলেট, কোমল পানীয় ও ফাস্টফুড কমিয়ে দিন।
৪. পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব
ঘুমের সময় শিশুর শরীরে কোষের পুনর্গঠন হয় এবং রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা আরও কার্যকরভাবে কাজ করে।
বয়সভেদে প্রয়োজনীয় ঘুম—
- ১–২ বছর: ১১–১৪ ঘণ্টা
- ৩–৫ বছর: ১০–১৩ ঘণ্টা
- ৬–১২ বছর: ৯–১২ ঘণ্টা
রাতে দেরি করে জেগে থাকা শিশুদের অসুস্থ হওয়ার ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি।
৫. হাত পরিষ্কার না রাখা
শিশুরা প্রায়ই খেলনা, মেঝে কিংবা বাইরের বিভিন্ন জিনিস স্পর্শ করার পর মুখে হাত দেয়। এতে সহজেই জীবাণু শরীরে প্রবেশ করে।
শিশুকে শেখান—
- খাবারের আগে হাত ধোয়া
- টয়লেট ব্যবহারের পরে সাবান দিয়ে হাত ধোয়া
- বাইরে থেকে এসে হাত-মুখ পরিষ্কার করা
- নখ ছোট রাখা
৬. সময়মতো টিকা না নেওয়া
টিকাদান একটি শিশুকে বহু মারাত্মক সংক্রামক রোগ থেকে সুরক্ষা দেয়। জাতীয় টিকাদান কর্মসূচির সব টিকা নির্ধারিত সময়ে দেওয়া উচিত।
প্রয়োজনে শিশু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ অনুযায়ী অতিরিক্ত ভ্যাকসিনও নেওয়া যেতে পারে।
৭. অ্যালার্জি বা হাঁপানি
সব সময় বারবার কাশি বা সর্দির কারণ সংক্রমণ নয়। অনেক শিশুর ক্ষেত্রে ধুলাবালি, ফুলের রেণু, পশুর লোম বা ঠান্ডা আবহাওয়ার কারণে অ্যালার্জি দেখা দেয়।
যদি দেখা যায়—
- রাতে বেশি কাশি হয়
- ধুলায় গেলে সমস্যা বাড়ে
- শ্বাস নিতে কষ্ট হয়
- শোঁ শোঁ শব্দ হয়
তাহলে দ্রুত শিশু বিশেষজ্ঞ বা অ্যালার্জি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।
৮. অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ ও বায়ুদূষণ
বাড়িতে ধুলাবালি, স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ, সিগারেটের ধোঁয়া এবং বায়ুদূষণ শিশুর শ্বাসতন্ত্রের সমস্যা বাড়িয়ে দেয়।
বিশেষ করে পরিবারের কেউ ধূমপান করলে শিশুর সামনে ধূমপান করা সম্পূর্ণ বন্ধ করা উচিত।
৯. অযথা অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার
অনেক অভিভাবক সামান্য জ্বর বা সর্দি হলেই নিজের ইচ্ছায় অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ান। এটি অত্যন্ত ক্ষতিকর অভ্যাস।
ভাইরাসজনিত অধিকাংশ সংক্রমণে অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করে না। বরং অপ্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে ভবিষ্যতে ওষুধের কার্যকারিতা কমে যেতে পারে।
কখন অবশ্যই চিকিৎসকের কাছে যাবেন?
নিচের লক্ষণগুলোর যেকোনো একটি দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হোন—
- ৩ দিনের বেশি উচ্চ জ্বর
- শ্বাস নিতে কষ্ট
- বারবার বমি
- শিশু কিছুই খেতে না পারা
- অতিরিক্ত দুর্বল বা ঝিমিয়ে থাকা
- খিঁচুনি
- ঠোঁট বা নখ নীল হয়ে যাওয়া
- প্রস্রাব কমে যাওয়া
- ডিহাইড্রেশনের লক্ষণ
ডাক্তারদের পরামর্শ অনুযায়ী শিশুকে সুস্থ রাখার উপায়
শিশু বিশেষজ্ঞরা সাধারণত নিচের বিষয়গুলো অনুসরণ করার পরামর্শ দেন—
- সুষম ও পুষ্টিকর খাবার খাওয়ান।
- প্রতিদিন মৌসুমি ফল ও শাকসবজি দিন।
- পর্যাপ্ত পানি পান করান।
- নিয়মিত খেলাধুলা ও শারীরিক কার্যক্রমে উৎসাহিত করুন।
- প্রতিদিন পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করুন।
- সময়মতো সব টিকা সম্পন্ন করুন।
- সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন।
- অপ্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করবেন না।
- অসুস্থ ব্যক্তির সংস্পর্শ এড়িয়ে চলুন।
- নিয়মিত শিশু বিশেষজ্ঞের স্বাস্থ্যপরীক্ষা করান।
সঠিক যত্ন ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
প্রশ্ন-উত্তর (FAQ)
১. শিশুর বছরে কতবার সর্দি-কাশি হওয়া স্বাভাবিক?
স্কুল বা ডে-কেয়ারে যাওয়া শিশুদের বছরে ৬–৮ বার পর্যন্ত ভাইরাল সর্দি-কাশি হওয়া স্বাভাবিক হতে পারে।
২. বারবার জ্বর মানেই কি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল?
না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এটি সাধারণ ভাইরাল সংক্রমণের কারণে হয়। তবে ঘন ঘন গুরুতর সংক্রমণ হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
৩. শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে কী খাওয়াবো?
ডিম, মাছ, দুধ, ডাল, শাকসবজি, মৌসুমি ফল এবং পর্যাপ্ত পানি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ভালো রাখতে সহায়ক।
৪. অ্যান্টিবায়োটিক কি সব জ্বরের জন্য প্রয়োজন?
না। ভাইরাসজনিত জ্বরের ক্ষেত্রে অ্যান্টিবায়োটিক কার্যকর নয়। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা উচিত নয়।
৫. কখন দ্রুত শিশু বিশেষজ্ঞের কাছে যাব?
শ্বাসকষ্ট, দীর্ঘস্থায়ী উচ্চ জ্বর, খিঁচুনি, ডিহাইড্রেশন, বারবার বমি বা শিশু খাবার-পানি গ্রহণ করতে না পারলে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে।
উপসংহার
শিশুদের বারবার অসুস্থ হওয়া অনেক ক্ষেত্রেই তাদের স্বাভাবিক বেড়ে ওঠার একটি অংশ। কারণ এই সময়ে তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ধীরে ধীরে শক্তিশালী হয়। তবে সুষম খাদ্য, পর্যাপ্ত ঘুম, পরিচ্ছন্নতা, সময়মতো টিকাদান এবং নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শ অনুসরণ করলে শিশুকে অনেক সংক্রমণ থেকে নিরাপদ রাখা সম্ভব। কোনো অস্বাভাবিক লক্ষণ দেখা দিলে নিজে ওষুধ না দিয়ে দ্রুত শিশু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ সিদ্ধান্ত।